’উন্নয়ন অন্বেষণ’র ডিসেম্বর অর্থনৈতিক পর্যালোচনা : ব্যাংকিং খাতে মন্দাবস্থা

ঢাকা,২১ ডিসেম্বর, (এনএসনিউজওয়্যার) — স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ’উন্নয়ন অন্বেষণ’র ডিসেম্বর মাসের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা মতে, ঋণ বিতরণ ও প্রবৃদ্ধির হারে নি¤œগতি এবং ঝুকি ব্যবস্থাপনায় অপকর্ষ ব্যাংকিং খাতের মন্দাবস্থাকে নির্দেশ করে। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, হ্রাসকৃত ঋণ বিতরণ বিনিয়োগ হ্রাসের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারকে সংকুচিত করবে।

ব্যাংকিং খাতে নেয়া উদারিকরণ নীতিসমূহ সুদের হার কমাতে এবং আর্থিক অন্তভূক্তি ত্বরান্বিত করতে পারে নাই। পাশাপাশি দুর্বল তত্ত্বাবধান ব্যবস্থার ফলে শ্রেণী বিণ্যাসকৃত এবং খারাপ ঋণের পরিমান বেড়ে গেছে।

বিভিন্ন কেলেঙ্কারী ঝুকি ব্যবস্থাপনাকে অধিক মন্দাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঋণের বিস্তার ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির মধ্যে যোগসূত্র নির্দেশ করে ’উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলছে যে, ঋণের প্রবৃদ্ধির হারের নি¤œগতি বিনিয়োগ হ্রাস করবে। ফলে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জন্য ধার্যকৃত ৭.২ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনের ৩২ শতাংশ বিনিয়োগ দরকার।

সরকার ও বেসরকারি খাতে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ঋণের প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়ে ১১.৫২ শতাংশে দাঁড়ায়, যা গত বছরের একই সময়ে ১৭.৭২ শতাংশ ছিল।

২০১৩ সালের জুলাই থেকে সেপ্টম্বর মাস নাগাদ ঋণ প্রবাহ গত বছরের একই সময় থেকে ১০.১৮ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু উক্ত বৃদ্ধি মুদ্রানীতিতে ধার্যকৃত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৫.৩২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রা ১৫.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে।

শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ ২০১২-১৩ অর্থবছরের শেষ চতুর্থাংশের ৯৭২০.৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম চতুর্থাংশে ৮৮৮০.৭৯ কোটি টাকা দাঁড়ায়, যা গত পাঁচ চতুথাংশের মধ্যে সবচেয়ে কম। যদি এই প্রবণতা চলতে থাকে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় চতুথাংশে শিল্প ঋণ কমে গিয়ে ৮৬৫৭.৮৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির প্রক্ষেপণ মতে প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্বক ২.৫১ শতাংশ হতে পারে।

২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে কৃষি ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ১৪৩.২ শতাংশ ছিল এবং ২০১৩ সালের সেপ্টম্বর মাসে প্রবৃদ্ধির হার ঋণাত্বক ৫.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ঋণ নিয়ে কেলেঙ্কারী বেড়েছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও খেলাপী ঋণ বেড়েছে; সম্পদের আয় হার (জবঃঁৎহ ড়হ ধংংবঃং) এবং ইক্যুইটির আয় হারের (জবঃঁৎহ ড়হ বয়ঁরঃু) ক্রমাগত অবনতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

২০১২ সালে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক সম্পদ আয়ের হার ০.৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১০ সালে ১.৩ শতাংশ ছিল। যদি এ ধারা চলতে থাকে, সার্বিক সম্পদ আয় হার ২০১৩ সালে ০.৫৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

ইক্যুইটির আয় হারের মাধ্যমে ব্যাংকের অংশিদারদের মুনাফা পরিমাপ করা হয়। ব্যাংকিং খাতে সার্বিক ইক্যুইটি বাবদ আয় ২০১১ সালে ১৪.৩ শতাংশ ছিল, যা ২০১২ সালে ৬.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৭.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। যদি বর্তমান অবস্থা চলতে থাকে, ২০১৩ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৬.৮০ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।

আর্থিক অন্তভুক্তি বিষয় পর্যালোচনা করতে গিয়ে ’উন্নয়ন অন্বেষণ’ বলছে যে, গ্রাম এলাকায় ব্যাংকের শাখা ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ৫৭.৯৪ শতাংশ ছিল, যা ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কমে ৫৭.২০ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ শহর অঞ্চলে ব্যাংকের শাখা ৪২.০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে ৪২.৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর বিদেশী ব্যাংকের কোন শাখা এখন পর্যন্ত গ্রামে স্থাপিত হয়নি।

ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা বিরাজ করছে। যেমনঃ ইক্যুইটির আয় হার এবং সম্পদের আয় হার ক্রমাগত অবনতি অন্যদিকে খেলাপী ঋণের পরিমান ২০১১ ও ২০১২ সালের থেকে বেশি দেখা গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তবে ২০১৩ সালে আরও অবনতি হতে পারে।

’উন্নয়ন অন্বেষণ’র মতে, সঠিক তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা অর্জন এবং বিচক্ষণ নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব।