স্পেকট্রাম মূল্য হ্রাসের দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের, বাড়তে পারে ৪৫ বিলিয়ন ডলার প্রবৃদ্ধি
টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা স্পেকট্রামকে শুধুমাত্র সরকারি রাজস্ব আহরণের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সাশ্রয়ী মূল্যে পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম বরাদ্দ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব মতামত প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী (অব.) এবং এমটব প্রেসিডেন্ট ও রবি আজিয়াটার সিইও জিয়াদ সাতারা।
টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন গ্রামীণফোন সিইও ইয়াসির আজমান, এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার, বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ এবং রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলমসহ খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান। বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিষয়ক পরামর্শক ড. খালেদ মাহমুদও বক্তব্য দেন।
স্পেকট্রাম মূল্য আঞ্চলিক গড়ের চেয়েও বেশি বক্তারা জানান, সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্পেকট্রাম বরাদ্দের মূল্য এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অথচ উন্নত ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে স্পেকট্রামের মূল্য অর্ধেক বা তারও বেশি কমিয়েছে।
জিএসএমএ-এর গবেষণা তথ্য তুলে ধরে তারা বলেন, বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের মোট রাজস্বের অন্তত ১৬ শতাংশ স্পেকট্রাম ফি পরিশোধে ব্যয় হয়। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যেখানে এ হার গড়ে ১০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক গড় মাত্র ৮ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের ব্যয় অনেক বেশি।
আলোচনায় অপারেটরদের প্রতিনিধিরা বলেন, পাকিস্তান, ভারত, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ সম্প্রতি ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে স্পেকট্রাম বরাদ্দ ফি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশ আবার অতিরিক্ত অর্থ আদায় ছাড়াই স্পেকট্রামের মেয়াদ বাড়িয়েছে। ফলে দেড় দশক আগের মূল্য নির্ধারণের যুক্তি বর্তমান বাস্তবতায় আর প্রযোজ্য নয়।
নবায়নে মূল্য না কমালে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বাধা
বক্তারা জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নবায়ন অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় দেড় দশক আগে উচ্চ মূল্যে বরাদ্দ দেওয়া এই স্পেকট্রামের নবায়নে মূল্য হ্রাস না করা হলে অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সেবার মান বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
সাশ্রয়ী মূল্যে ৫জি সম্ভাবনা ৩৪-৪৫ বিলিয়ন ডলার বক্তাদের মতে, স্পেকট্রামের ইউনিট মূল্য আঞ্চলিক গড়ের কাছাকাছি আনা গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ৯৯ শতাংশ এলাকায় ফাইভজি সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে এবং অর্থনীতিতে অতিরিক্ত ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবৃদ্ধি যোগ হতে পারে। আর বৈশ্বিক গড় দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করা গেলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
উচ্চ কর ও ভ্যাট বাড়তি চ্যালেঞ্জ বক্তারা উল্লেখ করেন, স্পেকট্রাম মূল্যের পাশাপাশি উচ্চ ভ্যাট ও করও অপারেটরদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে স্পেকট্রাম বরাদ্দ ফি, বার্ষিক স্পেকট্রাম চার্জ এবং তার ওপর ভ্যাট আরোপের কারণে অপারেটরদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলনামূলকভাবে বিরল। অন্যদিকে, গ্রাহকপ্রতি গড় আয় দেড় মার্কিন ডলারেরও কম।
তারা আরও বলেন, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখনও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। পাশাপাশি ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের হাতে এখনও স্মার্টফোন নেই। গড়ে একজন গ্রাহক মাসে পাঁচ থেকে ছয় গিগাবাইটের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না। এ অবস্থায় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার ঘটাতে সাশ্রয়ী ব্যয়ে উন্নত নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
‘স্পেকট্রাম থেকে রাজস্ব আহরণের চিন্তা পরিবর্তনের সময় এসেছে’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান বলেন, “২০০৮ সালে স্পেকট্রাম বরাদ্দের সময় ১৮ বছরের জন্য স্পেকট্রাম দেওয়া হয়েছিল এবং তখন থেকে এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্পেকট্রাম থেকে রাজস্ব আহরণ করা। তবে গত ১৫-১৮ বছরে টেলিযোগাযোগ খাত দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে—যেমন সীমিত স্পেকট্রাম হোল্ডিং, অপর্যাপ্ত ফাইবার অবকাঠামো, টাওয়ার সাইটে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং স্পেকট্রামের উচ্চমূল্য। এসব সীমাবদ্ধতা সেবার মান খারাপ করার পাশাপাশি খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সক্ষমতাকেও সীমিত করেছে। ২০২৫ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯৩তম অবস্থানে ছিল।”
“আজ বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি: একই পদ্ধতি অব্যাহত রাখা, নাকি আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার মাধ্যমে একটি বড় অগ্রযাত্রা শুরু করা,” যোগ করেন তিনি।
স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি?
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, সমমানের অন্যান্য বাজারের বৈশ্বিক উদাহরণ দেখায় যে আরও প্রগতিশীল স্পেকট্রাম নীতি—বিশেষ করে সাশ্রয়ী মূল্যে বেশি পরিমাণ স্পেকট্রাম এবং দ্রুততর সময়সীমার মধ্যে বরাদ্দ—নেটওয়ার্কের মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে পারে। উন্নত কানেক্টিভিটি ডিজিটাল সেবা, ই-কমার্স, ফিনটেক, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল কনটেন্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং অন্যান্য উদীয়মান শিল্পের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে।
বক্তাদের অভিমত, ভবিষ্যতে ইন্টারনেটের চাহিদা যেভাবে বাড়বে এবং সরকার ও গ্রাহকরা যে মানের ডিজিটাল সেবা প্রত্যাশা করেন, তা বাস্তবায়নে স্পেকট্রামের মূল্য বর্তমান স্তরের অর্ধেকেরও নিচে নামিয়ে আনার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত।
তারা বলেন, এখন সুযোগ হলো স্পেকট্রামকে শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক সরকারি রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে একে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অনুঘটক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
