টেলিকম খাতের টেকসই রূপান্তরে দীর্ঘ মেয়াদী কর কাঠামোর তাগিদ

দেশের টেলিকম খাতের বর্তমান চিত্র, ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও নতুন সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা নিয়ে এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার ১৬ মে, ২০২৬ সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ: নতুন সরকার কী ভাবছে?’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে।

বৈঠকে বক্তারা জানান, জাতিসংঘের ‘টেলিকমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনডেক্স ২০২৪’ অনুযায়ী ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২৩তম। এই খাতের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রযুক্তি পণ্যের কর কমানো, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো এবং জনগণের প্রত্যাশার সাথে সরকারি পদক্ষেপের সমন্বয় করে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দেন তারা।

টিআরএনবি সভাপতি সমীর কুমার দে-এর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবি। অনুষ্ঠানে রবির রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান সাহেদ আলম ‘শেপিং দা এরা অফ টেলিকম: বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভ’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

উচ্চপর্যায়ের এই নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব ফকির মাহবুব আনাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জনাব রেহান আসিফ আসাদ এবং মুখ্য আলোচক ছিলেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী।

এছাড়াও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল কবীর, বাংলাদেশ কম্পিটিশন কমিশনের সাবেক পরিচালক খালেদ আবু নাসের, বুয়েটের অধ্যাপক ড. লুৎফা আক্তার, টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী এবং বাংলালিংকের হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স তাইমুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রী জনাব ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সরকার ৫জি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে গুরুত্বের সাথে কাজ করছে। এই খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ এবং আগামী ৫ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম প্রতিষ্ঠান বিক্রি করছে না, বরং প্রান্তিক ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক স্থাপন ও সাইবার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।


বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জনাব রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং বিশ্বে শীর্ষ ২০টি টেলিকম দেশের তালিকায় যাওয়ার লক্ষ্যে একটি পলিসি রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে। জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৮ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। অপারেটরদের দাবির প্রেক্ষিতে তিনি জানান, আগামী বাজেটে কর কাঠামোর একটি দীর্ঘমেয়াদী ও ৫ বছরের জন্য পূর্বাভাসযোগ্য সংস্কার নিয়ে সরকার কাজ করছে।

মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, নতুন লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় কোনো মনোপলি থাকবে না। সেবার মান নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, তরঙ্গের দাম কমলে রাজস্ব বাড়বে—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান থাকলে বিটিআরসি তা খতিয়ে দেখতে চায়। তিনি জানান, বিটিআরসি বর্তমানে একটি ‘জাতীয় কানেক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান’ তৈরিতে কাজ করছে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় রবির রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান ব্যারিস্টার সাহেদ আলম বলেন, সংযোগের সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো উদ্ভাবন হাব হতে পারেনি। ডিজিটাল অর্থনীতি বিনির্মাণ, প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন সেবার অনুমোদন সহজসহ জরুরি নীতি সংস্কার প্রয়োজন; কারণ এআই ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির মূল ভিত্তি টেলিকম হলেও রেগুলেটরি ব্যবস্থা এখনো পিছিয়ে। তিনি খাতের ৫টি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন: দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের পূর্বাভাসযোগ্য রাজস্ব কাঠামো; আধুনিক তরঙ্গ নীতি; দ্রুত একক উইন্ডোতে অনুমোদন ও অবকাঠামো ভাগাভাগি; টেলিকম-ব্রডব্যান্ড-ডাটা সেন্টার নীতির জাতীয় সমন্বয়; এবং সাইবার নিরাপত্তা ও ডাটা গভর্ন্যান্স। পাশাপাশি ডাটা ট্রাফিকের ব্যয়ভার বহনে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ন্যায্য বাণিজ্যিক অবদানের দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ যদি একটি সত্যিকারের ডিজিটাল অর্থনীতি চায় যা উচ্চ-মূল্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াবে, তবে টেলিকম নীতি অবশ্যই আধুনিক এবং বিনিয়োগ-বান্ধব হতে হবে।”

প্রতিযোগিতা আইন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ কম্পিটিশন কমিশনের সাবেক পরিচালক জনাব খালেদ আবু নাসের বলেন, বাজারের প্রায় ৯১ শতাংশ মুনাফা একটি কোম্পানির কাছে চলে যাচ্ছে যা মনোপলি তৈরি করছে। বিটিআরসি-কে কেবল রাজস্ব সংগ্রাহক হিসেবে কাজ না করে কম্পিটিশন কমিশনের সাথে যৌথভাবে ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার জাতীয় গ্রিড থেকে ডাটা সেন্টারগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগকে সহায়তা করার অনুরোধ জানান।

ফিকি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব টিআইএম নুরুল কবীর একটি সুনির্দিষ্ট টেলিকম রোডম্যাপ তৈরি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং বিটিআরসি-এর ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনসহ কর সংস্কারের দাবি জানান।

বুয়েটের অধ্যাপক ও টেলিকম বিশেষজ্ঞ ড. লুৎফা আক্তার বিটিআরসি-এর সম্পূর্ণ ডিজিটাল রূপান্তর, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সেবার মান উন্নয়নের তাগিদ দেন।

বাংলালিংকের হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স জনাব তাইমুর রহমান তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণ, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের উন্নয়ন এবং অবকাঠামো ভাগাভাগির মতো উদীয়মান সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানির (টেলিটক) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি বকেয়া ও তরঙ্গ বরাদ্দ সংক্রান্ত কিছু রিপোর্টের ব্যাখ্যা দেন এবং টেলিটকের উন্নয়নে নতুন সরকারি বিনিয়োগের অনুরোধ জানান।


পরিশেষে, বক্তারা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে একটি বিনিয়োগ-বান্ধব, বৈষম্যহীন এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই নীতিমালার পক্ষে একমত পোষণ করেন।